Skip to content

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নেটওয়ার্ক অটোমেশনের রাস্তা

আমি গত ১৭ বছর ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছি। এই সময়ে দশটা বই লিখেছি এআই নিয়ে। প্রতিটা বইয়ে চেষ্টা করেছি এআইকে সহজ করে তুলে ধরতে, মানুষকে বোঝাতে যে এটা আসলে কতটা শক্তিশালী একটা টেকনোলজি। তবে চার বছর আগে এসেছি আইএসপি ইন্ডাস্ট্রিতে। আর এই পুরো সময়টা জুড়ে আমার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে - কীভাবে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নেটওয়ার্ক অটোমেশনে আনা যায়?

কারণটা সহজ। আমি দেখেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গত কয়েক বছরে কত দ্রুত এগিয়েছে। এমন এমন কাজ করছে যেগুলো আমরা ভাবতেই পারিনি। ইমেজ রিকগনিশন থেকে শুরু করে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং - সব জায়গায় এআই ম্যাজিক দেখাচ্ছে। কিন্তু নেটওয়ার্কিং? সেখানে আমরা এখনও অনেকটা পিছিয়ে। আমরা এখনও অনেক কিছু ম্যানুয়ালি করছি, অনেক কিছুতে হিউম্যান ইন্টারভেনশন লাগছে।

এই পার্থক্যটা আমাকে ভাবিয়েছে। নেটওয়ার্কিং সেক্টর কেন এআই-এর বিপ্লবে পিছিয়ে? কেন আমরা নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্টে এআই ব্যবহার করতে পারছি না সেভাবে?

নেটওয়ার্ক অটোমেশনের ধীর গতি

নেটওয়ার্কের কাজ সেভাবে এগোয়নি যেভাবে এগিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ। এটা একটা তিক্ত সত্য। কিন্তু এর পেছনে কারণ আছে। নেটওয়ার্কিং একটা ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এখানে ভুল করার সুযোগ খুবই কম। একটা ভুল মানে হাজার হাজার কাস্টমার অফলাইনে চলে যাওয়া। তাই নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়াররা স্বভাবতই কনজারভেটিভ - নতুন টেকনোলজি নিতে একটু ভয় পান।

আর দ্বিতীয় কারণ হলো, নেটওয়ার্ক অটোমেশনের জন্য যে ফাউন্ডেশন দরকার, সেটা অনেক জায়গায় নেই। আমরা যদি এআই ইউজ করতে চাই নেটওয়ার্কে, তাহলে আমাদের ডেটা লাগবে - ক্লিন, স্ট্রাকচার্ড, রিলায়েবল ডেটা। আর সেই ডেটা পেতে হলে আমাদের নেটওয়ার্ক স্ট্রাকচার্ড হতে হবে।

কিন্তু আশার কথা হলো, গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। গুগল, ফেসবুক, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন তারা ক্লাউড আর নেটওয়ার্কে প্রচুর ইনভেস্ট করেছে। ফলে ওপেনসোর্স কম্যুনিটিতে চলসে এসেছে অনেক অটোমেশন ফ্রেমওয়ার্ক।

অটোমেশন টুলের উত্থান

গত কয়েক বছর ধরে নেটওয়ার্কের মধ্যে বেশ কিছু অটোমেশন টুল এসেছে যেটা আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছে। Ansible, Nautobot, NETCONF, RESTCONF, gRPC - এই টুলগুলো নেটওয়ার্ক অটোমেশনকে একটা নতুন মাত্রা দিয়েছে। এগুলো আমাদের দেখিয়েছে যে নেটওয়ার্ক অটোমেশন শুধু সম্ভবই না, বরং প্র্যাক্টিক্যাল এবং ইফেক্টিভ।

Ansible দিয়ে আমরা এখন শত শত ডিভাইসে একসাথে কনফিগ পুশ করতে পারি। Nautobot দিয়ে আমরা পুরো নেটওয়ার্কের একটা সিঙ্গেল সোর্স অফ ট্রুথ বানাতে পারি। API-ড্রিভেন নেটওয়ার্কিং আমাদের দিয়েছে প্রোগ্রামেটিক কন্ট্রোল।

এই টুলগুলো আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে এখন সময় এসেছে পরের ধাপে যাওয়ার। পরের ধাপ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

ধাপে ধাপে এগোনো

কিন্তু এখানে একটা ব্যাপার পরিষ্কার করা জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো ম্যাজিক না যেটা যে কোনো নেটওয়ার্কে চালিয়ে দিলেই কাজ করবে। এআই কাজ করতে পারে শুধুমাত্র তখনই যখন তার নিচের লেয়ারগুলো শক্ত হয়।

একটা বাড়ির কথা ভাবুন। আপনি যদি একটা সুন্দর, আধুনিক বাড়ি বানাতে চান, তাহলে প্রথমে কী করবেন? একদম শুরুতে একটা শক্ত ফাউন্ডেশন বানাবেন। তারপর দেয়াল তুলবেন, ছাদ দেবেন, তারপর প্লাস্টার, পেইন্ট, ইন্টেরিয়র ডিজাইন। আপনি কখনোই ফাউন্ডেশন না বানিয়ে সরাসরি ইন্টেরিয়র ডিজাইনে যাবেন না। কারণ সেটা টিকবে না।

নেটওয়ার্ক অটোমেশনেও একই ব্যাপার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো সবার উপরের লেয়ার। কিন্তু এটা চালাতে হলে নিচের লেয়ারগুলো আগে শক্ত করতে হবে।

প্রথম লেয়ার হলো বেসিক অটোমেশন। স্ক্রিপ্ট লেখা, রিপিটিটিভ কাজগুলো অটোমেট করা। এই নিয়ে আমি লিখেছিলাম "নেটওয়ার্ক এবং আইএসপি অটোমেশন" বইয়ের প্রথম খন্ডে। সেখানে দেখিয়েছি কীভাবে Ansible, Python দিয়ে নেটওয়ার্কের বেসিক কাজগুলো অটোমেট করা যায়।

দ্বিতীয় লেয়ার হলো নেটওয়ার্ক সোর্স অফ ট্রুথ। এটা হলো বেজলাইন - আপনার নেটওয়ার্কের একটা সিঙ্গেল, অথরিটেটিভ রেকর্ড। যেখানে সব ডেটা স্ট্রাকচার্ড, ক্লিন, আপ-টু-ডেট। এই নিয়েই লেখা হচ্ছে দ্বিতীয় খন্ড।

আর তৃতীয় লেয়ার হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যেটা আসবে যখন প্রথম দুটো লেয়ার শক্ত হবে।

বেজলাইন সেট করা - দ্বিতীয় খন্ডের উদ্দেশ্য

এই বইটা, "নেটওয়ার্ক এবং আইএসপি অটোমেশন - খন্ড ২", এর মূল উদ্দেশ্য হলো সেই বেজলাইন সেট করা। নেটওয়ার্ক সোর্স অফ ট্রুথ কী, কেন দরকার, কীভাবে বানাতে হয় - এই সব কিছু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।

কারণ আমি বিশ্বাস করি, এই বেজলাইন ছাড়া এআই অকার্যকর। আপনি যত শক্তিশালী এআই মডেলই ব্যবহার করেন না কেন, যদি আপনার ডেটা গোলমেলে থাকে, যদি আপনার নেটওয়ার্ক আনস্ট্রাকচার্ড থাকে - এআই কিছুই করতে পারবে না। বরং ভুল ডিসিশন নেবে, ভুল কনফিগ পুশ করবে।

কিন্তু যদি আপনার NSoT শক্ত হয়, যদি আপনার ডেটা ক্লিন হয়, যদি আপনার নেটওয়ার্ক স্ট্রাকচার্ড হয় - তাহলে এআই ম্যাজিক দেখাতে পারবে। তখন এআই আপনার নেটওয়ার্ক অ্যানালাইজ করতে পারবে, প্যাটার্ন খুঁজে বের করতে পারবে, প্রবলেম প্রেডিক্ট করতে পারবে, এমনকি কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নিজে নিয়ে নিতে পারবে।

তিন খন্ডের ভিশন

আমার মাথায় আপাতত: একটা ভিশন আছে। তিনটা খন্ডের একটা সিরিজ যেটা নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে যাবে ম্যানুয়াল নেটওয়ার্ক থেকে এআই-পাওয়ার্ড নেটওয়ার্কে।

প্রথম খন্ড: বেসিক অটোমেশন। কীভাবে স্ক্রিপ্ট লিখতে হয়, কীভাবে রিপিটিটিভ টাস্ক অটোমেট করতে হয়। এখানে আমরা শিখেছি Ansible, Python, APIs।

দ্বিতীয় খন্ড: নেটওয়ার্ক সোর্স অফ ট্রুথ। কীভাবে নেটওয়ার্ককে স্ট্রাকচার করতে হয়, কীভাবে ডেটা অর্গানাইজ করতে হয়, কীভাবে বেজলাইন সেট করতে হয়। এই বইটা সেই যাত্রা।

তৃতীয় খন্ড: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কীভাবে মেশিন লার্নিং ইউজ করে নেটওয়ার্ক অপটিমাইজ করতে হয়, কীভাবে এআই দিয়ে ট্রাবলশুটিং করতে হয়, কীভাবে প্রেডিক্টিভ মেইনটেন্যান্স করতে হয়। এটা আসবে যখন দ্বিতীয় খন্ডের ফাউন্ডেশন শক্ত হবে।

কেন এই ধাপে ধাপে এগোনো জরুরি

অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, "আরে, সরাসরি এআই দিয়ে শুরু করলে হয় না? এত ধাপে ধাপে যাওয়ার কী দরকার?"

উত্তরটা আমি একটা উদাহরণ দিয়ে দিই। ধরুন, আপনার কাছে একটা সুপার-পাওয়ারফুল স্পোর্টস কার আছে। ফেরারি, ল্যামবোর্গিনি - যা বলেন। কিন্তু আপনি যে রাস্তায় চালাবেন সেই রাস্তা ভাঙা, গর্ত ভরা, আঁকাবাঁকা। এখন সেই রাস্তায় কি আপনি ফেরারির ফুল স্পিড ইউজ করতে পারবেন? পারবেন না। বরং গাড়ি নষ্ট হবে।

এআইও তাই। এআই একটা সুপার-পাওয়ারফুল টুল। কিন্তু এটা চালাতে হলে একটা স্মুথ, স্ট্রাকচার্ড পরিবেশ লাগে। সেই পরিবেশ তৈরি করাই হলো আমাদের প্রথম কাজ।

আর একটা ব্যাপার। ধাপে ধাপে এগোলে আপনি প্রতিটা লেয়ার ভালো করে বুঝতে পারবেন। প্রথমে বেসিক অটোমেশন শিখলে আপনি বুঝবেন কীভাবে নেটওয়ার্ক প্রোগ্রামেটিক্যালি কন্ট্রোল করতে হয়। তারপর NSoT শিখলে বুঝবেন কীভাবে ডেটা ম্যানেজ করতে হয়। তারপর যখন এআই আসবে, আপনার একটা শক্ত ফাউন্ডেশন থাকবে। আপনি বুঝবেন এআই আসলে কী করছে, কীভাবে করছে।

কিন্তু যদি সরাসরি এআই দিয়ে শুরু করেন, তাহলে সেটা হবে ব্ল্যাক বক্স। আপনি জানবেন না ভেতরে কী হচ্ছে। আর যখন কিছু ভুল হবে, আপনি 'ডিবাগ' করতে পারবেন না।

লুকিং ফরওয়ার্ড

এই বইটা আপনাকে রেডি করবে পরের ধাপের জন্য - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তখন আমরা দেখব কীভাবে মেশিন লার্নিং মডেল ট্রেইন করতে হয় নেটওয়ার্ক ডেটা দিয়ে। কীভাবে এআই দিয়ে অ্যানোমালি ডিটেক্ট করতে হয়। কীভাবে প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স ইউজ করে ভবিষ্যতের সমস্যা আগেই জানা যায়।

কিন্তু সব কিছুর আগে, আমাদের এই বেজলাইন সেট করতে হবে। আর সেটা করতেই এই বই।